এক সময় রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় অবস্থিত ট্যানারিগুলোর বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে ক্রমাগত দূষিত হতো পরিবেশ। মাত্রাতিরিক্ত দূষণে হাজারীবাগের পানির রঙ হয়ে উঠেছিল কালো, ধূসর ও গাঢ় নীল। ১৯৮৬ সালে প্রথম উদ্যোগ নেয়ার দীর্ঘদিন পর ২০১৭ সালে সরকারের প্রচেষ্টায় হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর করা হয়।

ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের পর বর্তমানে হাজারীবাগ এলাকার ভূমি পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকার ভূমি পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে বসবাসের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে রাজউক। একটি উন্নত আবাসিক এলাকার মতো এখানে থাকবে পার্ক, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, মার্কেট, ইনডোর গেমস, সুইমিংপুল, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়সহ নানা ব্যবস্থা।

ভূমি স্বত্ব পরিবর্তন পদ্ধতি সম্পর্কে জানা গেছে, বর্তমান সম্পত্তির সমমূল্যের আবাসিক-বাণিজ্যিক স্পেস পাবেন প্রত্যেক ভূমির মালিক। কমিউনিটি স্পেসগুলো হবে সমন্বিত মালিকানায়। সম্পত্তি মূল্যায়ন পদ্ধতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান বাজারমূল্যে বিদ্যমান জমির মূল্যায়ন হবে; ঘর/কাঠামোর প্রতিস্থাপন খরচ একই বিল্ডিং উপকরণের বর্তমান মূল্যে মূল্যায়ন হবে; বর্তমান কাঠামোর মূল্যনির্ধারণ (বিল্ডিং বয়স, উপকরণ খরচ এবং বাসস্থান ইউনিট) হবে; বর্তমান বাজারমূল্যে বিদ্যমান বাণিজ্যিক স্পেসের মূল্য নির্ধারণ হবে; মালিকানাধীন বেসরকারী জমির মালিক এবং যাদের মালিকানার কোন আইনী নথি নেই, কিন্তু জমিটি দীর্ঘ মেয়াদে ভোগ করছেন, তারা কর্তৃপক্ষের অধীনে গঠিত সম্পত্তি মূল্যায়ন কমিটি দ্বারা নির্ধারিত সম্পত্তি পাবেন এবং মাল্টিপল লিনিয়ার রিগ্রেশন মডেল ব্যবহার করে সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের সমীকরণ হবে।

সেই সঙ্গে প্রকল্প-পরবর্তী সম্পত্তি মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে উন্নত সুযোগ-সুবিধার কারণে জমির মূল্যবৃদ্ধি পাবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক জায়গা পাওয়া যাবে, যার বাজারমূল্য বর্তমানের অনুরূপ আবাসিক ও বাণিজ্যিক জায়গার চেয়ে বেশি হবে। বিষয়গুলো ভেবে প্রকল্পের আগেই প্রকল্প-পরবর্তী প্রাপ্ত সম্পত্তির মূল্য হিসাব করা হবে।

এদিকে ট্যানারি শিল্পের কারণে হাজারীবাগ এলাকার মাটি বিষাক্ত হয়ে আছে। ট্যানারি শিল্পের বর্জ্যরে কারণে মাটিতে মিশেছে ক্রোমিয়াম, লেড ও আর্সেনিকের মতো ভারি ও বিষাক্ত ধাতু। অবস্থান ভেদে মাটির গভীরে এ দূষণের মাত্রা ৮ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত ছাড়িয়েছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। হাজারীবাগ এলাকার মাটি সরিয়ে নতুন মাটি ভরাটের উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানকার ভূমি ১০-১২ ফুট পর্যন্ত দূষিত। ৮-১০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে বিশুদ্ধ মাটি দিয়ে ভরাট করে মানুষের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থেকে দূষিত ভূমি দূরে রাখতে হবে।

রাজউকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে প্রতিদিন ৭৫ টন কঠিন বর্জ্য এবং ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য কোন ধরনের পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি খোলা ড্রেন দিয়ে মাটি, পানি ও নদীতে গিয়ে পড়তো। এতে পুরো এলাকায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। বর্জ্যরে সঙ্গে মাটিতে গিয়ে মেশা ক্রোমিয়াম ধাতু মাটি ও পরিবেশের জন্য একটি ধীরগতির বিষ, যা কখনও ধ্বংস হয় না বরং ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটির সঙ্গে মিশতে থাকে। ফলে হাজারীবাগের মাটি ও পানিতে ক্রোমিয়াম থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে এখানকার ভূমি প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত দূষিত। তাই ৮ থেকে ১০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে বিশুদ্ধ মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে হাজারীবাগ এলাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পৃথিবীর অনেক দেশ আরবান রিডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে তাদের শহরগুলোর ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহরে তা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেসব দেশ সফল আরবান রিডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নিয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া।

রাজউকের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, নগর পরিকল্পনা, নগর উন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজউক অধিভুক্ত এলাকার পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে পরিকল্পনার বিষয়টি অনুষ্ঠানিকভাবে ট্যানারি মালিক এ্যাসোসিয়েশনকে জানিয়েছে রাজউক। এতে মালিকরা প্রাথমিকভাবে সম্মতিও জানিয়েছেন। হাজারীবাগ এলাকার আয়তন ৬৫.৫৯ একর। সীমানার উত্তর পাশে রায়েরবাজার, পূর্বে জিগাতলা ও পিলখানা, পশ্চিমে হাজারীবাগ ও বেড়িবাঁধ, দক্ষিণে বোরহানপুর। বর্তমানে ৫৮৭টি শিল্প-কারখানা, ৯৮টি বাণিজ্যিক ও ৯৪টি আবাসিকসহ মোট স্থাপনার সংখ্যা ৮৭৪টি।

হাজারীবাগের উন্নয়নের বিষয়ে প্রকল্পটির পরিচালক এবং রাজউকের ডিটেল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) পরিচালক আশরা ুল ইসলাম বলেন, মাটি দূষিত হওয়ায় নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে উপযুক্ত মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে- রাজউকের সহযোগিতায় ভূমি মালিক সমিতির নিজস্ব উদ্যোগের মাধ্যমে, রাজউকের সহযোগিতায় ভূমি মালিক সমিতির সঙ্গে ডেভেলপার কোম্পানির চুক্তির মাধ্যমে, ভূমি মালিক সমিতির সঙ্গে রাজউকের চুক্তির মাধ্যমে, বিদেশী ঋণদাতা সংস্থা, দেশী ঋণদাতা সংস্থা বেসরকারী ব্যাংক অথবা সরকারী নিজস্ব তহবিল থেকে প্রকল্পের অর্থায়ন হবে। পুনঃউন্নয়নের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা রাজউককে তাদের মতামত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের মাধ্যমে মাটি ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে হবে; কমপক্ষে ৮ ফুট লেয়ারের মাটি অপসারণ করতে হবে; জমির ওপর যথাসম্ভব স্থাপনা কম রেখে খোলা জায়গা বেশি রাখতে হবে; স্থাপনায় বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি এলাকাটিতে ভূমির মিশ্র ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং হাইজেনিক রাখতে হবে। কমিউনিটির অভ্যন্তরে গাড়ির চলাচল অনুৎসাহিত করা এবং অযান্ত্রিক বাহনকে উৎসাহিত করা হবে।

 

সূত্রঃ দৈনিক জনকণ্ঠ

Please follow and like us:

মন্তব্য করুন

A PHP Error was encountered

Severity: Core Warning

Message: PHP Startup: Unable to load dynamic library 'imagick.so' (tried: /opt/alt/php72/usr/lib64/php/modules/imagick.so (libMagickWand-6.Q16.so.2: cannot open shared object file: No such file or directory), /opt/alt/php72/usr/lib64/php/modules/imagick.so.so (/opt/alt/php72/usr/lib64/php/modules/imagick.so.so: cannot open shared object file: No such file or directory))

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: