ফাঁকে বাড়তি ছুটি মিলিয়ে এবার ঈদ উপলক্ষে ছুটির আমেজ থাকবে কমপক্ষে ৯ দিনের। রেলপথ, নৌপথ ও সড়কপথে ঈদ যাত্রার জন্য ঢাকার টার্মিনাল ও স্টেশনে যেতেই এবার নাভিশ্বাস উঠবে। ৫ জুন ঈদুল ফিতর হতে পারে ধরে নিয়ে আগাম টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের। তবে ঢাকা থেকে বেরিয়ে মহাসড়কে উঠতে এখনই ঘাম ঝরছে যানজটে। ঈদ যাত্রায় সদরঘাট কিংবা কমলাপুর রেলস্টেশনে যেতেই মাটি হবে আনন্দ।

ধাপে ধাপে পোশাক কারখানা ছুটি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ছুটিও বেশি নিচ্ছে অনেকে। বাড়তি ট্রাফিক পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে। ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি শেষ হয়েছে গতকাল রবিবার। বাস ও নৌযানের টিকিট পেতে চলছে শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ। এ অবস্থায় ঢাকার প্রধান প্রবেশপথগুলো এক সপ্তাহ ধরেই অবরুদ্ধ থাকছে। গতকালও রাজধানীতে যানজট ছিল ভয়াবহ। বিকেলে গন্তব্যে যেতে অ্যাপভিত্তিক পরিবহনসেবার গাড়িও পায়নি অনেক যাত্রী। কারণ সেগুলো আটকে ছিল যানজটে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন গুণের বেশি গাড়ি চলাচল করছে রাজধানীতে। ঈদ সামনে রেখে কেনাকাটা বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি গাড়ির চাপ সামাল দিতে পারছে না ট্রাফিক পুলিশ। মেটো রেলসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাস্তার অংশ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে আমিনবাজার, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে আব্দুল্লাহপুর, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে কাঁচপুর, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রাবাড়ী অংশ দিয়ে ঈদযাত্রীদের বাড়ি যেতে হবে।

যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর অংশ আট লেনের। এ ছাড়া বিদ্যমান কাঁচপুর সেতুর পাশাপাশি চালু হয়েছে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু। তার পরও ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের গাড়িগুলোকে যাত্রাবাড়ী থেকেই বিশৃঙ্খলায় পড়তে হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত শনিবার দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু চালু করা হয়েছে। ফলে গতকাল মহাসড়কে যানজট ছিল না। তবে যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর অংশে যানজট ছিল। এনা পরিবহনের চালক শফিকুল হক বাবুল সকাল ৯টায় সায়েদাবাদ থেকে রওনা দেন। বাবুল বলেন, রাস্তা চওড়া হলেও কাঁচপুর যেতে দেড় ঘণ্টা লেগেছে। রাস্তায় একের পর এক বাসের পার্কিংয়ের ফলে সৃষ্টি হয় যানজট।

ঢাকা অবকাঠামো পরিকল্পনার খসড়া প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকায় গড়ে দিনে পাঁচ লাখ যাত্রী আসে ও চলে যায়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, ঈদ যাত্রার জন্য এবার ৩০ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ছয় দিনে কমপক্ষে ৬০ লাখ যাত্রী ঢাকা থেকে বাড়িমুখো হবে। দিনে কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষ বাড়ির উদ্দেশে নামবে। চারটি বাস টার্মিনাল, দুটি রেলস্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল দিয়ে যাত্রীদের নির্দিষ্ট পরিবহনে যেতে হবে বাড়ি।

ঢাকা অবকাঠামো পরিকল্পনার খসড়া প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, সদরঘাট টার্মিনাল থেকে দিনে গড়ে দূরপাল্লার নৌযান চলাচল করে ৯০টি। ঢাকা থেকে ১৫০টি রুট ধরে এক লাখ ৭০ হাজার যাত্রী সদরঘাট হয়ে চলাচল করে স্বাভাবিক সময়ে। নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঈদ যাত্রায় নৌপথে যাত্রীর চাপ পড়ে দ্বিগুণের বেশি। ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সদরঘাটে যাত্রী পরিবহনের সরাসরি বাস খুব কম থাকায় ঘাটে যেতে দুর্ভোগে পড়তে হয়।

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সদরঘাটের আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনেই বাস থামিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। সেখানে বাস থেকে নেমে হেঁটে টার্মিনালে যাচ্ছিল যাত্রীরা। বরিশালের টিকিট কিনতে সদরঘাটের দিকে হাঁটছিলেন যাত্রী নওফেল মিয়া। তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদপুর থেকে সকাল ১১টায় রওনা দিয়ে গুলিস্তান আসতেই চার ঘণ্টা চলে গেল। এখনই এ অবস্থা হলে বাড়ি যাওয়ার আগে পরিস্থিতি কী হবে?’

কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ১১০টি ট্রেনে দিনে গড়ে এক লাখ ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করে স্বাভাবিক সময়ে। তবে এবার প্রতিদিন তার দ্বিগুণের বেশি যাত্রী চলাচল করবে। গতকাল শেষ হয়েছে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি। শেষ দিনে ভিড় ছিল কমলাপুর, তেজগাঁও, বনানী, বিমানবন্দর রেলস্টেশন ও ফুলবাড়িয়া পুরনো রেল ভবনের টিকিট বিক্রয় কেন্দ্রে। ৩১ মে শুরু হবে ট্রেনে ঈদযাত্রীদের মূলস্রোত। ঢাকার ৯৮ শতাংশ রুটের সঙ্গে কমলাপুর রেলস্টেশনের সরাসরি বাস যোগাযোগ নেই। অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ভাড়ায় চালিত গাড়িতেই ওই স্টেশনে যেতে হয়। কমলাপুরে যুক্ত হওয়া সব সড়কে গতকালও ছিল প্রচণ্ড যানজট। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভারের গাড়ির চাপ এসে যোগ হয় রাজারবাগে। সেখান থেকে কমলাপুরমুখী গাড়িগুলো যেন আর সামনে এগোয় না। কারণ সামনেই আইডিয়াল স্কুলের কাছে, শাহজাহানপুর রেল কলোনির কাছে রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে স্থানে স্থানে। বলাকা পরিবহনের যাত্রী শাহ খুররুম আলী বিকেল সাড়ে ৩টায় বলেন, ‘সকাল সোয়া ১১টায় গাজীপুর থেকে রওনা দিয়েছি। আব্দুল্লাহপ র থেকে মহাখালী পার হতেই আড়াই ঘণ্টা লেগেছে। ৪ জুন রংপুর যাওয়ার টিকিট কিনতে দুজন লোক লাইনে রেখেছি। তারা টিকিট পেয়েছে, তবে রেলস্টেশনে আসাই তো কঠিন হবে। কারণ ঢাকায় গাড়ি চলেই না।’

গাবতলী বাস টার্মিনাল দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে ৬১টি রুটে দিনে চলাচল করে প্রায় ৫০ হাজার যাত্রী। দিনে বাস চলে গড়ে দেড় হাজার। আগামী ৩০ মে থেকে এই টার্মিনাল ও এর আশপাশের কাউন্টার থেকে বাস চলাচল করবে ঈদযাত্রী নিয়ে। হানিফ, শ্যামলী, নাবিল, এসআর পরিবহনসহ বিভিন্ন পরিবহন কম্পানি ট্রিপ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু গাবতলী থেকে আমিনবাজারে রয়েছে ছোট-বড় ট্রাক টার্মিনাল। ছোট গাড়ির আধিক্যে যানজট লেগেই থাকছে। দক্ষিণ-পশ্চিমের ২১ জেলার যাত্রীরা ভিড় করতে শুরু করলে এখানে যানজট পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে বলে মনে করছে গাড়িচালকরা। বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘যাত্রীর চাপ কমাতে আমরা বাস বাড়িয়েছি। টিকিট বিক্রিও করেছি আগে থেকে। বিআরটিএ থেকে ভিজিল্যান্স টিম করা হয়েছে। তবে তৈরি পোশাক কারখানা ভিন্ন দিনে ছুটি দিলে যানজট কম হবে।’

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে শুরু হয়ে গেছে তীব্র যানজট। ঢাকা থেকে পূর্বাঞ্চলের ১৬ জেলায় ওই টার্মিনাল থেকে বাস চলে। গতকাল সায়েদাবাদ ছাড়াও গোলাপবাগ ও এর আশপাশে কাউন্টারের পাশে বাস পার্ক করে যাত্রী তুলতে দেখা গেছে। এতেই বিদ্যমান সড়ক সংকুচিত হয়ে যানজট তৈরি হয়েছে। শ্যামলী পরিবহনে চট্টগ্রাম যাওয়ার জন্য বাসে অপেক্ষারত যাত্রী নুরজাহান বেগম বলেন, ‘নতুন দুটি সেতু খুলেছে। তার পরও যানজট হবে। এই ভয়ে আজই যাচ্ছি। কিন্তু পান্থপথ থেকে বাস ছেড়ে এখানে আসতেই দুই ঘণ্টা লেগেছে।’

জনপথ মোড়, গোলাপবাগসহ সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫০০ বাস কাউন্টার রয়েছে। বাস পার্ক করা ও যখন-তখন বাস ঘোরানোয় সায়েদাবাদ থেকেই যানজট শুরু হয়ে চলে কাঁচপুর পর্যন্ত। ওই টার্মিনাল থেকে ৮৭টি রুটে দিনে ৭৯০টি বাসে ৩৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয় স্বাভাবিক সময়ে। ঈদ যাত্রায় এবার এসব রুটে চাপ পড়বে আরো বেশি।

ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে ৩২ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয় দেড় হাজার বাস-মিনিবাসে। তবে এই টার্মিনালে যাওয়ার পথে গুলিস্তান ও এর আশপাশে গতকালও যানজট ছিল ভয়াবহ। ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আবুল কালাম বলেন, হকারদের তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে বাসচালকরা রাস্তায় বাস থামিয়ে যাত্রী তুলছে, তাই যানজট বেশি হচ্ছে।

মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে দিনে ৬০টি রুটে এক হাজার ১০০ বাসে গড়ে ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়। তবে ঈদ যাত্রার ছয় দিনে গড়ে দিনে ৬০ হাজারের বেশি যাত্রী চলাচল করবে বলে মনে করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গতকালও মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে বাস পার্ক করে রাখতে এবং বাস ঘোরাতে দেখা গেছে। ফলে সাতরাস্তা হয়ে আসার গাড়ি সেখানে আরো জট পাকাচ্ছিল। এই টার্মিনাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও উত্তরবঙ্গের কিছু অংশের মানুষকে চলাচল করতে হয়। তারা মহাখালী-বিমানবন্দর-আব্দুল্লাহপুর হয়ে রাজধানী ছাড়ে। ঢাকা-বগুড়া রুটের একতা পরিবহনের চালক মো. আলী বলেন, টার্মিনাল থেকে বের হতে সাতটি এবং ঢুকতে ১১টি স্থানে আটকে পড়তে হচ্ছে। মহাখালীতে আসার আগে গাজীপুর চৌরাস্তা, টঙ্গীর চেরাগ আলী, স্টেশন রোড, আব্দুল্লাহপুর মোড়, কুড়িল বিশ্বরোড, স্টাফ রোড, বনানী, কাকলী ও মহাখালীতে যানজটে পড়তে হচ্ছে।

 

সূত্রঃ কালের কন্ঠ 

Please follow and like us:

মন্তব্য করুন

A PHP Error was encountered

Severity: Core Warning

Message: PHP Startup: Unable to load dynamic library 'imagick.so' (tried: /opt/alt/php72/usr/lib64/php/modules/imagick.so (libMagickWand-6.Q16.so.2: cannot open shared object file: No such file or directory), /opt/alt/php72/usr/lib64/php/modules/imagick.so.so (/opt/alt/php72/usr/lib64/php/modules/imagick.so.so: cannot open shared object file: No such file or directory))

Filename: Unknown

Line Number: 0

Backtrace: